সাফ ফাইনাল এবং আনন্দ-বেদনা
কাঁধে ব্যাগ নিয়ে টিম বাসে ওঠার সময় আশফাক আলীকে ‘হাই’, ‘হ্যালো’ বললেন অনেকেই। কিন্তু কোনো দিকেই তাকালেন না মালদ্বীপের প্লে মেকার।
সুশীল কুমারের চোখে-মুখে আনন্দ ঠিকরে পড়ছিল। টিম বাসে ওঠার সময় সানন্দেই আগ্রহীদের সঙ্গে হাত মেলালেন ভারতের অধিনায়ক।
একটু আগে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে যা ঘটে গেল, এটিই হওয়ার কথা। মালদ্বীপ পারল না সাফ শিরোপা ধরে রাখতে। অনূর্ধ্ব-২৩ দল নিয়েও ভারত চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেল। ম্যাচের পর তাই আনন্দ-বেদনার ওই বিপরীত ছবি।
সেমিফাইনালে বাংলাদেশ দল ছন্নছাড়া ফুটবল খেলে বিদায় নেওয়ার পর ধারণা ছিল, মালদ্বীপ-ভারত ফাইনাল দেখতে বড়জোর চার-পাঁচ হাজার দর্শক আসতে পারে। কিন্তু দর্শক এল ১৫ হাজারেরও বেশি। যে ভারত বাংলাদেশ দলকে দর্শক বানিয়ে দিয়েছে সেমিফাইনাল শেষে, সেই ভারতের বিপক্ষে মালদ্বীপকেই সমর্থন দিয়ে গেল স্থানীয় দর্শকেরা। বৃথাই সেই সমর্থন, মালদ্বীপ পারল না।
কেন? ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে মালদ্বীপের কোচ ইস্তবান বেলা বললেন, ‘এটা কঠিন ম্যাচ ছিল। দুই দলই সুযোগ পেয়েছে। তবে আমাদের সুযোগ বেশি ছিল। কিন্তু আমরা পারিনি গোল করতে। গোল না পেলে আপনি জিততে পারবেন না।’
ভারত কিন্তু গোল না পেয়েও জিতল। টাইব্রেকারের ভাগ্য পরীক্ষায়। গোলরক্ষক অরিন্দম ভট্টাচার্যের কাছেই কি হেরে গেল মালদ্বীপ? ইস্তবান সরাসরি উত্তর দেওয়ার পথে গেলেন না, ‘হ্যাঁ সে খুব ভালো খেলেছে। টাইব্রেকারের ভাগ্য কখনো আপনি পাবেন, কখনো পাবেন না। এটা মানতেই হবে। টাইব্রেকারে জেতার জন্য অবশ্যই ভাগ্য দরকার।’
এই ভাগ্যকে দুষতে দুষতেই কাল রাতে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম ছেড়ে গেল কয়েক শ মালদ্বীপ সমর্থক, যারা দলের জয় দেখতে মালে থেকে বিশেষ বিমানে ঢাকা ছুটে এসেছে। এই সমর্থকদের মন খারাপ না করার জন্যই প্রকারান্তরে অনুরোধ করলেন ইস্তবেলা। ‘ভারত সংগঠিত দল। তবে আমরা যা খেলেছি, তাতে মালদ্বীপবাসীর গর্বিত হওয়া উচিত। এখানে এসে দলকে সমর্থন দেওয়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। আমরা টুর্নামেন্টে ১১ গোল করেছি, ভারত করেছে মাত্র ৩ গোল। এ থেকেই বুঝে নিন আমরা এই টুর্নামেন্টে কেমন দল ছিলাম।’
ঠিক এভাবে না বললেও ভারতীয় কোচ সুখবিন্দর সিং গর্ববোধই করলেন তাঁর খেলোয়াড়দের নিয়ে, ‘এই শিরোপা জয়ের সব কৃতিত্বই ছেলেদের।’ তারপর একটু পেছনে গিয়ে বলেন, ‘ইনজুরির কারণে গ্রুপের শেষ ম্যাচে সেরা দল নামাতে পারিনি। ফাইনালেও অনেকে চোট নিয়ে খেলেছে।’ এ কারণেই কি দ্বিতীয়ার্থে রক্ষণাত্মক হয়ে যায় ভারত? ‘হ্যাঁ, আমরা ইনজুরি-টিনজুরি মিলিয়ে এ অর্ধে একটু রয়েসয়ে খেলেছি’—কোচ হিসেবে দ্বিতীয়বার সাফ ফুটবল জেতা সুখবিন্দরের চোখে-মুখে পরিতৃপ্তির ছাপ।
হবেই তো। ২০০৫ সালে করাচিতে বাংলাদেশের কাছ থেকে সাফ শ্রেষ্ঠত্ব কেড়ে নেওয়া, ২০০৮ সালে কলম্বোতে মালদ্বীপের কাছে সেটি হারিয়ে ফেলা, তারপর তরুণ দল নিয়ে কাল আবার তা পুনরুদ্ধার। ছয়টি সাফ ফুটবলের চারটিতেই চ্যাম্পিয়ন হলো ভারত। এ অঞ্চলের ফুটবলে তারা যে ‘বাঘ’ সেটিই বুঝিয়ে দিয়ে গেল সুখবিন্দরের দল।
বাংলাদেশ দল কী বুঝল এতে? বুঝল, ২০০৩ সালে জেতা সাফ শিরোপা এখন বাংলাদেশের ফুটবলে দূর অতীতের এক স্মৃতি। সাফে এখন আর লড়তে পারে না বাংলাদেশ। তারপরও এবার ঘরের মাঠে বাংলাদেশের জন্য একটা পুরস্কার থাকল! ফেয়ার প্লে ট্রফি! ওটা তো কোনো সান্ত্বনা হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে ভারতীয় দল সাফ শিরোপাটা নেওয়ার সময় সেটি মালদ্বীপকে তীরবিদ্ধ করেছে, বাংলাদেশকেও করেনি?
করেছে। ডিডোর দল পছন্দ হয়নি বলে তাঁকে বরখাস্ত করে যে দল গড়া হলো, সেই দলটির শক্তি ছিল না ফাইনালে ওঠার। সুখবিন্দর সিং তাঁর দল নিয়ে দেশে যাওয়ার সময় বাংলাদেশের কর্তাদের বলে যেতে পারেন, ‘ওহে বন্ধু, নগদ সাফল্যের পেছনে না ছোটে দল তৈরি করো। ওটাই কাজে দেবে। যেমনটা আমরা করছি!


