নবোকভের ‘দ্য অরিজিনাল অব লরা’
নবোকভের ‘দ্য অরিজিনাল অব লরা’
— শিবব্রত বর্মন
বছরের শেষ দিকে এসে ভ্লাদিমির নবোকভের ভক্তদের জন্য একটা সুসংবাদ।
নবোকভের অন্তিম এবং অসমাপ্ত উপন্যাস বেরিয়েছে। নাম, ‘দ্য অরিজিনাল অব লরা’। বৃটেনে বইটির প্রকাশক পেঙ্গুইন। আর যুক্তরাষ্ট্রে নফ (Knof)।

রুশ বংশোদ্ভূত এ ‘ইংরেজি’ লেখকের শেষ ইচ্ছা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হলে এ বই অবশ্য কখনও আলোর মুখ দেখতো না। ১৯৭৭ সালে মৃত্যুর আগে নবোকভ তার স্ত্রী ভেরাকে কঠিন অথচ প্রত্যাশিত একটা নির্দেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যে-উপন্যাস লেখায় তিনি হাত দিয়েছেন, জীবদ্দশায় সেটি শেষ করতে ব্যর্থ হলে পাণ্ডুলিপিটা যেন ধ্বংস করে ফেলা হয়। নবোকভ কঠিন পারফেকশনিস্ট। আধাআধি কিছুই রেখে যেতে রাজি
নন। ভেরা মারা যান ১৯৯১ সালে। পাণ্ডুলিপিটা পুড়িয়ে ফেলেননি তিনি। স্বামীর শেষ ইচ্ছা পূরণে তার এই অকারণ দীর্ঘ গড়িমসি এক রহস্য। ভেরার মৃত্যুর পর পাণ্ডুলিপিটি ধ্বংস করার দায় বর্তায় তাদের ছেলে দিমিত্রির ওপর। তিনিও বাবা এবং মায়ের অন্তিম নির্দেশ পালনে দ্বিধায় ভুগে গেছেন। অবশেষে তাঁরও বিদায়ের ক্ষণ ঘনিয়ে এলো। সত্তর বছর বয়সে এসে দিমিত্রি তার পিতার ইচ্ছা অমান্য করার সিদ্ধান্তে স্থিত হতে পেরেছেন। সুইস ব্যাংকের ভল্ট থেকে বের করে প্রকাশকের হাতে তিনি তুলে দিয়েছেন পিতার অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি। গত ১৫ নভেম্বর বেরিয়েছে ১৩৮ পৃষ্ঠার একটা হ্যান্ডসাম অথচ জটিল বই।
বইটি আলোর মুখ দেখা উচিৎ কিনা এ নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে রীতিমতো তর্কযুদ্ধ চলেছে বিভিন্ন গরিষ্ঠ লেখক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। লেখকের শেষ ইচ্ছা পূরণ জরুরি, নাকি পাঠকের প্রাপ্তি বড়—তর্কটা এ নিয়ে। দিমিত্রি অবশ্য বইয়ে ভূমিকায় কৈফিয়ত দিতে গিয়ে বলেছেন, তার মনে হয়েছে, ‘একটি প্রতিভাদীপ্ত, মৌলিক এবং আগাপাশতলা ভিন্নরকম উপন্যাস হয়ে ওঠার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে এটির মধ্যে। নবোকভের বাকি সব কাজের চেয়ে এটি একেবারেই আলাদা।’
পাণ্ডুলিপি ধ্বংসের অন্তিম ইচ্ছা এভাবে অপূর্ণ থাকার উদাহরণ অবশ্য আরো আছে। মহাকবি ভার্জিল তার ইনিড ধ্বংস করে দিতে বলেছিলেন। রোমান সম্রাট অগাস্টাস সিজার সেটা মানেননি। ফ্রানৎস কাফকা তার সব অপ্রকাশিত লেখাই পুড়িয়ে ফেলতে বলেছিলেন বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে। ব্রড বন্ধুকৃত্য করলে আমরা ট্রায়াল, ক্যাসেল, আমেরিকা কিছুই পেতাম না। শুধু মেটামরফোসিস পেতাম। নিকোলাই গোগোল তার ডেড সোলস পুড়িয়ে ফেলতে বলেছিলেন।
নবোকভ তার এই উপন্যাসের খসড়া করেছেন, যেমনটা বরাবর করে থাকেন, বিভিন্ন ইনডেক্স কার্ডের উপর পেন্সিলে লিখে (ললিটা-ও নাকি এভাবেই লেখা)। কিছু কিছু করে লেখা হয়েছে, আর কার্ডগুলো সেক্রেটারিকে দিয়ে টাইপ করিয়ে নিয়েছেন। উপন্যাসটার ‘জায়মান’ চরিত্র বহাল রাখার জন্য প্রকাশকরা তাই চৌকস এক কৌশল নিয়েছেন। তারা নবোকভের হাতে লেখা ১৩৮টি ইনডেক্স কার্ড হুবহু ছেপে দিয়েছেন। বইয়ের ডানপাশের প্রতিটি পৃষ্ঠায় একটি করে ইনডেক্স কার্ড। আর সেটির নিচে ছাপার অক্ষরে ইনডেক্স কার্ডের টেক্সট। সামান্য কিছু ছন্নছাড়া বাক্য। কিন্তু তাতেই কাব্যসুধামাখা অসামান্য নবোকভিয়ান ইংরেজি গদ্যের স্বাদ লেগে আছে। বামপাশের পৃষ্ঠাগুলো সাদা। আরো একটা গিমিক করেছেন প্রকাশকরা। ডাকটিকিটের আদলে তারা ইনডেক্স কার্ডের চার ধার পারফোরেটেড করে দিয়েছেন। মানে পাঠক চাইলে ইনডেক্স কার্ডগুলো খুলে নিয়ে ভিন্ন ক্রমে সেগুলো সাজাতে পারেন। তাতে এই উপাখ্যানের বাইরে নতুন কোনো উপাখ্যান তৈরি হলে হতেও পারে।
প্রথম ৬০টি কার্ড মূল উপাখ্যানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ক্রমে সাজানো। কিন্তু এরপর আর ক্রম রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এরপর এগুলো লেখকের মাথার ভেতরে ঘনায়মান এক প্লটের বিক্ষিপ্ত ইঙ্গিত ছাড়া আর কিছু থাকেনি। এসব কার্ডের অনেকগুলোই হয়তো ব্যবহার করতেন না নবোকভ। ফেলে দিতেন। অনেকগুলো পাল্টে ফেলতেন। এই যুক্তিতে উপন্যাসের নামের সঙ্গে একটি উপনাম জুড়ে দিয়েছেন প্রকাশকরা: ‘আ নভেল ইন ফ্র্যাগমেন্টস’।
উপন্যাসের ভূমিকায় পুত্র দিমিত্রি নবোকভ এটিকে এক ‘নিদ্রিতভ্রুণ মাস্টারপিস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিলক্ষণ। অন্তত কাঠামোর দিক থেকে এটি যে কৌতূহলোদ্দীপক, তাতে সন্দেহ করার অবকাশ সামান্যই। ঔপন্যাসিক মার্টিন আমিস অবশ্য এটিকে লার্ভা আর পিউপার মাঝামাঝি দশা বলে চিহ্নিত করেছেন।
এ কাহিনির কেন্দ্রে এক পণ্ডিত ব্যক্তি আর ২৪ বছর বয়সী যৌনাবেদনময়ী এক নারীর প্রেম। লোকটির কোনো নাম দেওয়া হয়নি। মেয়েটির নাম ফ্লোরা। যে গল্পটি নবোকভ আমাদের শোনাচ্ছেন, সেটি এই ফ্লোরার জীবনের ‘সত্যিকার’ কাহিনি। ‘সত্যিকার’ কেন? কারণ, গল্পেই বলা হচ্ছে, ফ্লোরার জীবনের প্রেমকাহিনি নিয়ে একটি উপন্যাস লেখা হয়েছে পরবর্তীকালে। আর সেই উপন্যাসে ফ্লোরার চরিত্রটির নাম রাখা হয়েছে লরা। নবোকভের কাহিনির কথক উত্তম পুরুষে আমাদের জানাচ্ছেন, এই বানানো উপন্যাসটির নাম ‘মাই লরা’, আর ফ্লোরার জীবনের সত্যিকার প্রেমকাহিনি শেষ হওয়ার অল্প কিছুদিন পরেই ‘মাই লরা’ উপন্যাসটি লেখা শুরু হয়। এক বছরে সেটি লেখা শেষ হয়। এবং এর তিন মাস পর প্রকাশিত হয়। কথক আমাদের আরো জানাচ্ছেন, প্রকাশের পরপরই প্রথম সারির একটি দৈনিকের রিভিউকর্তা বইটিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে সমালোচনা লেখেন। তা সত্ত্বেও বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
তাহলে ব্যাপারটা একটু জটিলই দাঁড়ালো।
নবোকভের দ্য অরিজিনাল অব লরা উপন্যাসটির কথক আমাদের শোনাচ্ছেন ফ্লোরা নামে এক নারীর কাহিনি, যার জীবনের ঘটনা নিয়ে একটি জনপ্রিয় উপন্যাস লেখা হয়েছে এবং সেই উপন্যাসে ফ্লোরার নাম দেওয়া হয়েছে লরা। এই লরা চরিত্রটির পেছনে যে আসল ফ্লোরা আছেন, তার জীবনের কাহিনি আমাদেরকে জানাচ্ছে নবোকভের উপন্যাসের কথক। জানাচ্ছেন উপন্যাসে রূপ দিতে গিয়ে উপন্যাসিক ফ্লোরার জীবনের ঘটনায় কোথায় রং চড়িয়েছেন, কোথায় কিছুটা পাল্টে দিয়েছেন, কোথায় কিছু কথা গোপন করেছেন।
খুব ভালো কথা। কিন্তু সমস্যা হলো, ‘মাই লরা’ উপন্যাসের লরা চরিত্রটির পেছনের যে সত্য কাহিনি আমরা শুনতে বসলাম, সেটিও তো আসলে আরেকটা বানানো কাহিনিই—ফিকশন। এই ফিকশনের পেছনে হয়তো লুকিয়ে আছে আরেকটা সত্য ঘটনা। তার পেছনে আরেকটা। এভাবে সত্যি ঘটনার (নাকি ফিকশনের?) এক অন্তহীন শিকল উঁকি দিতে থাকে।
বোর্হেসিয়ান?
ইনডিড।



