গাড়ির ফিটনেস সনদ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ
সবুজ বাতি জ্বলে উঠেছে; তবু যাত্রীভর্তি বাসটির নড়াচড়ার লক্ষণ নেই। পেছনে আরো গাড়ি ভেঁপু বাজাচ্ছে। ইঞ্জিন চালু করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন চালক, কিন্তু সফল হচ্ছেন না। কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশ এসে বাসের গায়ে লাঠির বাড়ি দিয়ে বলে গেলেন- “এই সরা”। তবুও কাজ হচ্ছে না।
সোমবার আসাদ গেট এলাকায় দেখা মিললো এ দৃশ্যের। বাসটি ছিলো মোহাম্মদপুর-মতিঝিল রুটের রাজধানী এক্সপ্রেস। এ রকম চিত্র অবশ্য রাজধানীর পথে হামেশাই মেলে। কখনো কখনো ইঞ্জিনে বা গ্যাসের সিলিন্ডার ফুটো হয়ে আগুন লেগে যাচ্ছে।
গাড়ির ফিটনেস দেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)। তবে তারা বলছে, ফিটনেস সনদ ছাড়াই চলছে অনেক গাড়ি, যা পুলিশ ধরছে না।
পুলিশ উল্টো বলছে, বিআরটিএ কর্মকর্তাদের গাফিলতিতে নষ্ট গাড়িও পেয়ে যাচ্ছে ফিটনেস সনদ। ফলে তারা কিছু করতে পারছে না।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তায় রাজধানীর বাংলামটর, মতিঝিল ও মীরপুর রোড (নিউমার্কেট) এলাকায় তিনটি বাসে যান্ত্রিক ত্র”টির কারণে আগুন লেগে যায়। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক প্রধান) শফিকুর রহমান বাসের ফিটনেস সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিআরটিকে দোষী করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ফিটনেস সার্টিফিকেট না থাকলে আমরা মামলা করতে পারি। কিন্তু থাকলে তো কিছু করার নেই।”
“বিআরটিএ যথাযথভাবে যাচাই না করেই ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয়”, বলেন তিনি।
তবে পুলিশের এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বিআরটিএ’র পরিচালক (অপারেশন্স) সৈয়দ ইফতেখার হোসেন বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা ভালোভাবে যাচাই করেই গাড়িগুলোর ফিটনেস সার্টিফিকেট দিয়ে থাকি।”
তিনি বলেন, “অনেক গাড়িই ফিটনেস সার্টিফিকেট নেয় না। এগুলো ধরার দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সে দায়িত্ব তারা পালন করছে না। এ কারণে আমরা যখন মোবাইল কোর্ট চালু করিতখন প্রচুর ফিটনেস সার্টিফিকেটবিহীন গাড়ি ধরা পড়ে।”
ইফতেখার জানান, অচিরেই ফিটনেস সনদবিহীন যানবাহনগুলোর রেজিস্ট্রেশন নম্বর সংগ্রহ করে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। ফিটনেস সনদ সংগ্রহ না করলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বিআরটিএ’র সাবেক একজন চেয়ারম্যান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিআরটিএ যাচাই করে ফিটনেস দেয় না- এটা সত্যি। তবে বেশিরভাগ পুরনো গাড়ি ফিটনেস সার্টিফিকেট নিতেই আসে না। বিআরটিএ’কে যে পয়সা দিয়ে তাদের সনদ নিতে হবে, তার চেয়ে অনেক কম খরচে তারা পুলিশকে ম্যানেজ করতে পারে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গাড়িগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই বিভিন্ন সময় পথে ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ছে। এতে যানজট আক্রান্ত রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা হয়ে পড়ছে আরো বিশৃঙ্খল।
ট্রাফিক প্রধান শফিকুর বলেন, “রাজধানীর যানজট নিরসনে পুলিশ সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে। রাস্তায় গাড়ি বিকল হয়ে পড়লে যানজট যে বাড়ে, তা সেটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এক্ষেত্রে রেকার দিয়ে গাড়িটি সরিয়ে দেওয়া ছাড়া পুলিশের আর কিছু করার নেই।”
বাসের চালক, মালিক, যানবাহন সিএনজিতে রূপান্তরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীদের মতে, গাড়ির বেশিরভাগ সমস্যার উদ্ভব হয় ইঞ্জিন থেকে। জ্বালানি হিসেবে সিএনজি ব্যবহারের ফলে গাড়ির ইঞ্জিন খুব দ্রুত গরম হয়। এ জন্য সিএনজিচালিত যানবাহনের একটু বেশি যত�আাত্তির প্রয়োজন; কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা হয় না।
নাভানার তেজগাঁও সেন্টারের সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার ইলিয়াস উদ্দীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাসওয়ালারা (মালিক-চালক) একবার প্লাক লাগানোর পর গাড়ি বন্ধ হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত কোনো খোঁজই নেয় না। পাঁচ হাজার কিলোমিটার পর যে ওয়েল (মবিল) পরিবর্তন করার কথা, তারা তা ১৫/২০ হাজার কিলোমিটার চালিয়ে যান।
“ঠিকমতো এয়ার ফিল্টার পরিষ্কার করা হয় না। ইঞ্জিনের কুলিং সিস্টেমের রেডিয়েটরে কার্বন জমে যায়, প্যাসেজগুলোতে ময়লা জমে যায়। নিয়মিত পানি পরিবর্তন করা হয় না, পানির লেবেল চেক করে না। ফ্যান বেল্ট অকার্যকর হয়ে গেলেও পরিবর্তন হয় না। ফলে ইঞ্জিন ওভারহিট হয়ে যায়।”
তার মতে, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরম (ওভারহিট) হয়ে কার্যক্ষমতা হারায়।
সিলিন্ডারজনিত দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে ইলিয়াস বলেন, বাণিজ্যিক যানগুলোতে খরচ কমাতে অনেকে নিম্নমানের পাইপ কেটে তৈরি সিলিন্ডার অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার করেন। আবার অনেক সময় সিলিন্ডার মুখের জোড়া (সাটাপ বাল্ব) ঢিলা হয়ে বা ফেটে, পাইপ ফেটে গ্যাস লিক করে এবং তা থেকে আগুন লেগে দুর্ঘটনা ঘটে।
রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে গাড়িচালকদের অভিযোগের তীর মালিকদের বিরুদ্ধে।
রাজধানীর বাসচালক আলী হোসেন বলেন, “মালিকরা খালি ভাড়ার টাকা গুণে নেয়। গাড়ি ঠিকঠাক করার বিষয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই।”
তবে বাসচালকের সহকারী ইমরান আলী বলেন, “বেশিরভাগ বাসই দৈনিক চুক্তিভিত্তিক ভাড়া নিয়ে চালায় চালক-শ্রমিকরা। এ কারণে মালিক গাড়ি ঠিক করতে উৎসাহী হয় না। আর যারা ভাড়া নেয়, তারাও গাড়ি মেরামত বাবদ পয়সা খরচ করতে চায় না।”



