তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে নাটকীয় ঘোষণা আশা করছে ঢাকা
অভিন্ন নদী তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সইয়ের ব্যাপারে বাংলাদেশ জোর তত্পরতা চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের সময় এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। আগামী ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মধ্যে শীর্ষ বৈঠকের দিন ঠিক হয়েছে। শেখ হাসিনা ১০ জানুয়ারি রাতে ভারতের উদ্দেশে রওনা হবেন।
এ অবস্থায় আগামী ৪ জানুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠেয় যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির খসড়ার ব্যাপারে ভারতের সম্মতি আদায়ের চেষ্টা চালাবে। পররাষ্ট্র ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে জানান, পানিসম্পদ সচিবদের আলোচনা সফল হলে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির ব্যাপারে নাটকীয় সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি গতকাল বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ১০ জানুয়ারি রাতে দ্বিপক্ষীয় সফরে দিল্লি যাচ্ছেন। ১১ জানুয়ারি বিকেলে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর চূড়ান্ত হয়েছে। বিস্তারিত সময়সূচি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
দিল্লিতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের বৈঠকে তিস্তার ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হবে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সইয়ের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ঢাকায় জেআরসির সচিব পর্যায়ের বৈঠক হতে যাচ্ছে। জেআরসির মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের সময়সূচি এখনো নির্ধারিত হয়নি।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জেআরসির তিন দিনের বৈঠকে যোগ দিতে ভারতের পানিসম্পদ সচিব উমেশ নারায়ণ পাঁজিয়ারের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ৩ জানুয়ারি ঢাকায় আসছে। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পানিসম্পদ সচিব শেখ মো. ওয়াহিদ-উজ-জামান। ৪ থেকে ৬ জানুয়ারি দুই দেশের পানিসম্পদ সচিবেরা তিস্তা ছাড়াও ছয়টি অভিন্ন নদী ধরলা, দুধকুমার, মনু, মুহুরী, খোয়াই ও গোমতীর পানি বণ্টন, বেশ কয়েকটি নদীর ভাঙন রোধ, ইছামতী নদীর ড্রেজিং, ফেনী নদী থেকে ভারতের পানি প্রত্যাহারসহ পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলোচনায় তিস্তার পানি বন্টনের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ব্যাপারে অগ্রাধিকার থাকবে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ এ মাসে তিস্তা চুক্তির একটি খসড়া ভারতের কাছে হস্তান্তর করেছে। গঙ্গার পানি চুক্তির অনুসরণে নদীপ্রবাহের জন্য একটি অংশ রেখে অবশিষ্ট পানি দুই দেশের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ওই প্রস্তাবে। তিস্তার খসড়ায় বলা হয়েছে, নদীর পানির ২০ ভাগ স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য রেখে বাকি পানি সমান ভাগে দুই দেশ পাবে।
জানতে চাইলে শেখ মো. ওয়াহিদ-উজ-জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগামী মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় বৈঠক সফল হবে বলে আমি যথেষ্ট আশাবাদী। ওই বৈঠকটির সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের সময় তিস্তার ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হবে কি না।’ তবে তিনি বলেন, দিল্লিতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বেশ নাটকীয় ঘোষণা আসতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরসূচি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা গতকাল প্রথম আলোকে জানান, ভারতের দেওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিস্তারিত দিনক্ষণ চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। ভারতের প্রস্তাবের ব্যাপারে বাংলাদেশের সম্মতির বিষয়টি শুক্রবারের মধ্যে দিল্লিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পৌঁছানোর কথা। আগামী ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালন শেষে রাতে একটি বিশেষ ফ্লাইটে দিল্লির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা ছাড়বেন।
আগামী ১১ জানুয়ারি সকালে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার নেওয়া, রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে। এর পর প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হবে। ভারতের ক্ষমতাসীন সম্মিলিত প্রগতিশীল জোটের (ইউপিএ) চেয়ারপারসন ও কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সৌজন্য সাক্ষাত্ করার কথা। এ ছাড়া ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি, ভারতের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির সংসদীয় দলের নেতা সুষমা স্বরাজ, অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি, রেলমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার সময়সূচি নির্ধারণের প্রস্তুতি চলছে।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী ১২ জানুয়ারি আজমির শরিফে গিয়ে খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর কবর জিয়ারত করবেন। বিকেলে দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার নেবেন। পরদিন তিনি শান্তিনিকেতনে যাবেন। সেখানে মধ্যাহ্নভোজ শেষে তিনি কলকাতায় ফিরে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ জ্যোতি বসুর সঙ্গে দেখা করবেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর হোটেলে দেখা করবেন।


