সার্ক শীর্ষ সম্মেলন শুরু
নিউজ আওয়ার্স বিডি:
জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে যৌথ প্রচেষ্টার লক্ষ্য নিয়ে আজ বুধবার ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে শুরু হচ্ছে ষোড়শ সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। এতে অংশ নেবেন দক্ষিণ এশিয়ার ৮ জাতির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সংস্থা সার্কের তাই এবারের মূল প্রতিপাদ্য ‘জলবায়ু পরিবর্তন’। বিষয়টিকে মাথায় রেখে এ অঞ্চলের জন্য একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ঘোষণা আসবে এবারের সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে। পাশাপাশি আলোচনা হবে দারিদ্র্য বিমোচন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, সন্ত্রাসবাদ দমন, খাদ্য নিরাপত্তাসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে। আগামী এক বছরের কার্যক্রমের একটি ঘোষণাও আসবে এবারের সম্মেলন থেকে। শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি এবার পালিত হবে সার্কের রজতজয়ন্তী। প্রথমবারের মতো সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজনে তাই কোনো ত্রুটি রাখেনি পাহাড়কন্যা ভুটান। এরই মধ্যে সার্কভুক্ত ৮ দেশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ থিম্পুতে পৌঁছেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল মঙ্গলবার সকালেই থিম্পু পৌঁছেছেন। তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। আজ বিকালে থিম্পুর গ্র্যান্ড এসেম্বলি হলে এ বৈঠক শুরু হবে। আগামীকাল সার্ক ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ বৈঠক শেষ হবে। এতে অংশ নিচ্ছেন আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বাগতিক ভুটানের প্রধানমন্ত্রী জিগমে ওয়াই থিনলে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ নাশিদ, নেপালের প্রধানমন্ত্রী মাধব কুমার নেপাল, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি এবং শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি মাহিন্দা রাজাপাকসে। এ ছাড়াও থাকছেন সার্কের পর্যবেক্ষক দেশ অস্ট্রেলিয়া, চীন, ইরান, জাপান, মিয়ানমার, মরিশাস, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা। ১.৫ বিলিয়ন লোকসংখ্যা অধ্যুষিত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ থেকেই ১৯৮৫ সালে শুরু দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)’র কার্যক্রম। এ বছরই ২৫ বছর পূর্তি হলো। তাই বরাবরের চেয়ে এবারের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ হয়েছে ভিন্ন মাত্রা। এ অঞ্চলের দারিদ্র্যপীড়িত মানুষগুলোর মধ্যে তাই এ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আশা-আকাক্সক্ষা। ভুটান থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, গতকাল সকালেই থিম্পু পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বৈঠকে জলবায়ু পরির্বতনের ক্ষতি মোকাবিলায় আর্কটিক কাউন্সিলের আদলে সার্ক হিমালয়ান কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভিযোজনের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। এ অভিজ্ঞতার আলোকে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক অভিযোজন এবং গবেষণা সেন্টার স্থাপনেরও প্রস্তাব দিতে পারেন শেখ হাসিনা। সার্কের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ভুটান প্রায় ১০০ বছরের রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে প্রত্যর্পণ করেছে ২০০৮ সালে। এবারই প্রথম দেশটি সার্কের শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করছে। একটি সবুজ ও সুখী দক্ষিণ এশিয়া বিনির্মাণে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে এবার থিম্পু বৈঠকে দু’টি পৃথক ঘোষণা আসতে পারে। এ ছাড়া পরিবেশ এবং বাণিজ্য বিষয়ক দু’টি চুক্তি সই হবে। আশা করা যাচ্ছে প্রস্তাবিত পরিবেশ বিষয়ক সার্ক কনভেনশন এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব নিরূপমা রাও গতকাল থিম্পুতে সাংবাদিকদের বলেছেন, এ কনভেনশনের আওতায় জলবায়ু পরিবর্তন, উপকূল রক্ষা ব্যবস্থাপনা, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত বিভিন্ন গবেষণার কাজে এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা, যেমনÑ অভিজ্ঞতা বিনিময়, সক্ষমতা অর্জন এবং প্রযুক্তি বিনিময় করা যাবে। এ ছাড়া বাণিজ্য চুক্তির আওতায় থাকছে এ অঞ্চলের স্বাস্থ্য, সেবা, যোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তি এবং আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ। সার্ক উন্নয়ন তহবিলের (এসডিএফ) সদর দফতর উদ্বোধনের ঘোষণা আসছে থিম্পু সম্মেলন থেকে। এসডিএফের সদর দফতরটি থিম্পুতেই স্থাপিত হবে বলে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আপাতত ৩০ কোটি ডলার নিয়ে এর যাত্রা শুরু হবে। এ অর্থ সার্কভুক্ত দেশের সামাজিক ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে। সার্ক পর্যবেক্ষকরা এ তহবিলে বিশেষ অবদান রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। শীর্ষ বৈঠকের দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার সার্ক নেতারা সার্ক ভিলেজ এবং সার্কের অন্যান্য বিষয় নিয়ে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন। এ ছাড়া শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে সদস্য দেশগুলোর নেতাদের নিজেদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। একইদিন ‘থিম্পু ঘোষণা’ এবং ‘জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ঘোষণা’র মধ্য দিয়ে শেষ হবে ১৬তম সার্ক র্শীষ সম্মেলন। এদিকে সার্কের সবগুলো দেশে পেশাজীবীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরির ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে সার্ক স্ট্যান্ডিং কমিটি। এবার সই হতে যাওয়া সার্ক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সার্কের সবগুলো দেশে শিক্ষা কার্যক্রমে একটি পরিকল্পিত পাঠ্যক্রম সংযোজনের প্রস্তাব দেয়া বাংলাদেশ। এ অঞ্চলে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতেই এ প্রস্তাব দেয়া হয়। থিম্পু থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েসের এ প্রস্তাবকে আফগানিস্তান, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র সচিবরা গ্রহণ করেন। এটি বাস্তবায়ন হলে সার্কের যে কোনো দেশের পেশাজীবীরা সদস্য যে কোনো দেশে কাজ করতে পারবেন। তবে এ জন্য সদস্য দেশগুলোকেই ঠিক করতে হবে তারা কোন কোন সেক্টর বিদেশি পেশাজীবীদের জন্য উন্মুক্ত করবে। শীর্ষ সম্মেলনের আগে গতকাল সার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ফোরাম সার্ক কাউন্সিল অব মিনিস্টারস-এর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে ঘোষণাপত্রের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। এর আগে সার্ক স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সার্কভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্র সচিবরা অংশ নেন। এসব বৈঠকে অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী জিগমে থিনলি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। এদিকে শীর্ষ সম্মেলনকে সামনে রেখে অপরূপ সাজে সেজেছে পাহাড়কন্যা থিম্পু। পারো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে থিম্পু পর্যন্ত সার্কের সব দেশের পতাকা এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের পোস্টার শোভা পাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে দেশটির স্কুলের শিক্ষার্থীরা পতাকা হাতে রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে সার্ক নেতৃবৃন্দকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। এ ছাড়া শীর্ষ সম্মেলনের জন্য কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নিয়েছে ভুটান। দেশটির রাজকীয় সেনাবাহিনী এবং রাজকীয় পুলিশ রাজধানীর চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।


