ছাত্রদল: বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কার ও অন্তর্কলহ চরমে: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
নিউজ আওয়াস বিডি:
নতুন কমিটি গঠনের পর থেকেই গ্রুপ-উপগ্রুপ, সংঘর্ষ, বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কার ও অন্তর্কলহে সময় কাটছে ছাত্রদলের। নতুন কমিটির সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীম গ্রুপের ভেতরে ৪টি উপগ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এগুলোর মধ্যে টুকু গ্রুপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ওবায়দুল হক নাসির ও যুগ্ম আহ্বায়ক মহিদুল ইসলাম হীরুর নেতৃত্বে দু’টি এবং আলীম গ্রুপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আবদুল মতিন ও যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াহাবের মতাদর্শী দু’টি উপগ্রুপ রয়েছে। এ ছাড়া ছাত্রদলের নেতারা ছাত্র না হওয়ার কারণে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের সন্মুখীন। সব মিলিয়ে চরম অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে কমিটির নেতারা বিপাকে পড়েছেন।
প্রকাশ, ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি শিক্ষা, ঐক্য, প্রগতি স্লোগান নিয়ে ছাত্রদলের যাত্রা শুরু। এরপর থেকেই ছাত্রনেতাদের টেন্ডারবাজি ও ক্যাডারিজমের কারণে সংগঠনটির ভাবমূর্তি চরমভাবে জনসন্মুখে ভূলুণ্ঠিত হয়। ছাত্রদলের প্রথম সভাপতি মশিউর রহমান রাঙ্গা থেকে শুরু করে বর্তমান সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু সব ছাত্রনেতাই এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছেন।
জানা যায়, ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির ১৭৪ নেতার কেউই ছাত্র নন। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা আহ্বায়ক কমিটির ২০ নেতারও ছাত্রত্ব নেই। শুধু তাই নয়, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ঢাকা মহানগর, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা কমিটিতে স্থান পাওয়া ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মীর ছাত্রত্ব না থাকার তথ্য। সাধারণ কোনো ছাত্র সংগঠনে না আসায় দিন দিন ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর সংগঠনে পরিণত হচ্ছে ছাত্রদল। ছাত্রদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদকে মদদদানের অভিযোগ রয়েছে।
এসব বিষয় ও সংগঠনের সামগ্রিক তৎপরতা সম্পর্কে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, আমরা এখন চেয়ে আছি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দিকে। ১৯ মে’র মহাসমাবেশে তিনি যে কর্মসূচি দেবেন সেটা আমরা পালন করবো। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান কার্যক্রমের মধ্যে কমিটি পুনর্গঠন করছি। দেশের প্রায় ৩১টি জেলায় কমিটি গঠনের কাজ করেছি। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কর্মসূচি থাকলেই আমরা হাজির হবো। তিনি বলেন, যারা বিদ্রোহ করেছে তার অধিকাংশ ছাত্রলীগের সহায়তায় ও মদদে আমার ওপর হামলা করেছে। আমি এখন দলের কাজে বিভিন্ন জেলা সফর করছি। এ মুহূর্তে কেউ যদি প্রচার করে আমরা ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারছি না, এটা তাদের একান্তই মনগড়া। জঙ্গি কানেকশনের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য করা হয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক আলীমের বিরুদ্ধে রয়েছে বেশ পুরনো কিছু অভিযোগ। ২০০৪ সালের ১৮ মে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আলীমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ও হাওয়া ভবনে তারেক রহমানের কাছে অভিযোগ করেন। এ অভিযোগের প্রমাণ পেয়ে একই মাসের ৩০ তারিখ তার নেতৃত্বাধীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে আমিরুল ইসলাম খান আলীম বলেন, এসব অভিযোগ করা হয়েছে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য। আসলে এসব বিষয়ে আমি জড়িত নই। তিনি বলেন, খোকন-শিপন ছাত্রদলের কেউ নয়। তারা ছাত্রলীগের সঙ্গে মিশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করছে। ৩৫টি জেলায় এরই মধ্যে ছাত্রদলের কমিটি গঠনের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণায় খোকন-শিপনকে প্রতিপক্ষ মনে করেন কি-না প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা এরই মধ্যে কমিটি ঘোষণার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু তারা ছাত্রলীগের সঙ্গে মিশে শহীদ জিয়ার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। আমাদের নেতৃত্বেই সারা দেশে ছাত্রদল ঐক্যবদ্ধ আছে।
সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম খোকন ও সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আহসান উদ্দিন খান শিপন। ছাত্রদলের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত দুই নাম। গত ১ জানুয়ারি ছাত্রদলের কমিটি হওয়ার পর প্রতিবাদমুখর হয়ে টুকু-আলীমকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন তারা। পারিপার্শ্বিক চাপে ব্যাকফুটে চলে যান খোকন-শিপন। ১/১১’র পর আবারো সক্রিয় হন এই দুই নেতা। পরবর্তীতে তাদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কার হয়েও অদ্যাবধি তারা ঢাবি ক্যাম্পাস দখলে রেখেছেন। বিদ্রোহী বা পদবঞ্চিত যেভাবেই তাদের সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেন ছাত্রদলে তারাই বর্তমানে মূল ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিভিন্ন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারবিরোধী মিছিল-মিটিং তারা করছেন ছাত্রদলের ব্যানারেই। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ, ঢাকা কলেজের একাংশ, মহানগর দক্ষিণসহ নানা ইউনিটের সদস্যরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের সঙ্গে রয়েছে বলে দাবি করেছেন শেখ আবদুল হালিম খোকন। তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে আমাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। তাই আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়েছি। আর আমাদের এই অবস্থান কেবল টুকু-আলীমের বিরুদ্ধে। ছাত্রদল তো নয়ই অন্যদের বিরুদ্ধেও নয়। আপনাদের এ অবস্থান কতো দিন থাকবে? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যতোদিন পর্যন্ত টুকু-আলীম তাদের কৃর্তকমের উপযুক্ত সাজা না পাবে ততোদিন। টুকু-আলীমকে সরিয়ে ছাত্রদলে মেধাবী, ত্যাগী ও দলের প্রতি দায়বদ্ধ নেতাদের দিয়ে কমিটি না করা পর্যন্ত এ অবস্থান থাকবে বলে জানান। আপনাদের অনেকে সরকারের এজেন্ট হিসেবে অভিহিত করে? প্রশ্নের জবাবে বলেন, দেখুন ১/১১’র দলের চরম খারাপ সময়ে অনেক লোভনীয় প্রস্তাব পেয়েছিলাম। কিন্তু দলের সঙ্গে বেইমানী করিনি। আজ যখন দলের অবস্থা দিন দিন ভালো হচ্ছে তখন কেন সরকারের এজেন্ট হবো। বরং যারা এসব কথা বলে ১/১১ পর তাদের কি অবস্থান ছিল তা খতিয়ে দেখলেও বের হবে কারা সরকারের এজেন্ট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ওবায়দুল হক নাসির বলেন, দেশের সব জেলায়, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রদলের কমিটির জন্য ৬টি কমিটি কাজ করছে। বৃহস্পতিবার শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এখন ছাত্রদলে কোনো বিরোধ নেই। তিনি বলেন, আমাদের ওপর নির্ভর করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে কোনো ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করলে আমরা জীবনবাজি রেখে তা পালন করবো। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও স্কুলবিষয়ক সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ নাসির আজকালের খবর’কে বলেন, খোকন-শিপনের ছাত্রদলে কোনো অবদান নেই। ছাত্রলীগ তাদের অর্থায়নের মাধ্যমে হাকিম চত্বরে বসিয়ে রেখেছে। ছাত্রলীগের মতো ঘৃণ্য দলের সঙ্গে যারা মিশতে পারে তারা কখনো ছাত্রদলের নেতা হতে পারেন না। তারা আলোচনায় এসেছে বর্তমান কমিটির বিঘ্ন সৃষ্টিকারী হিসেবে। স্বয়ং বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে তাদের দলকে বহিষ্কার করা হয়েছে।


