হায় পলিথিন!
স্টাফ রিপোটার:
রাজধানীসহ সারা দেশে নিষিদ্ধ পলিথিন বাণিজ্য বেড়েই চলছে। পরিবেশ দূষিত করা এ পলিথিন দেশের কয়েকশ কারখানায় উৎপাদন করে প্রতিনিয়ত বাজারজাত করা হচ্ছে। প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগ বিচ্ছিন্নভাবে পলিথিন প্রতিরোধের অভিযান চালালেও কোনোভাবেই পলিথিনের উৎপাদন, বাজারজাত কিংবা পাচার রোধ করা যাচ্ছে না। পুরান ঢাকার লালবাগ, সোয়ারিঘাট, নিমতলীসহ বেশকিছু এলাকায় পলিথিন উৎপাদন করা হচ্ছে। উৎপাদনে কিছুটা গোপনীয়তা থাকলেও প্রকাশ্যে তা বাজারজাত করা হচ্ছে। এলাকাবাসীর দাবি, প্রশাসনের ছত্রছায়ায় উৎপাদন এবং বাজারজাত করা হচ্ছে পরিবেশ নষ্টকারী এসব পলিথিন। পরিবেশবাদী সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)’র সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীতে প্রতিদিন ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ১ কোটি পলিথিন ব্যাগ। ঢাকা শহরের এমন কোনো মার্কেট, বিপণি বিতান ও কাঁচাবাজার নেই যেখানে পলিথিনের ব্যবহার হচ্ছে না। এমনকি বিভিন্ন অলিগলির দোকান ও মুদিখানাগুলোতে পলিথিনের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। পুরান ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে কয়েকশ পলিথিন কারখানা। এসব কারখানা থেকে উৎপাদিত পলিথিন ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। একাধিক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে পলিথিনের উৎপাদন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এখান থেকে পুলিশ বড় অংকের মাসোয়ারা নেয় বলেও জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুরান ঢাকার একাধিক বাসিন্দা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরান ঢাকার কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, চকবাজারের আবাসিক এলাকা, সোয়ারীঘাট, দেবীদাস ঘাট, কোতোয়ালি, বংশাল, সূত্রাপুর থেকে ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, ফতুল্লায় বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে কয়েকশ পলিথিন কারখানা। এর মধ্যে কামরাঙ্গীরচর এলাকায় রয়েছে প্রায় ১০টি কারখানা। লালবাগ এলাকার আশপাশে রয়েছে অর্ধশত কারখানা। চকবাজার, সোয়ারীঘাট ও দেবীদাস ঘাটে রয়েছে ১৫ থেকে ২০টি কারখানা। মৌলভীবাজার ও বেগমবাজারে রয়েছে ২০ থেকে ২৫টি কারখানা। কোতোয়ালি, সূত্রাপুর এলাকায় রয়েছে প্রায় অর্ধশত কারখানা। ডেমরা যাত্রাবাড়ীর কাজলা থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে আরো প্রায় শতাধিক পলিথিন কারখানা। এ ছাড়া পুরান ঢাকার বিভিন্ন অলিগলিতে ঘিঞ্জি পরিবেশে গড়ে উঠেছে আরো কিছু পলিথিন কারখানা। ডেমরার বাসিন্দা মহসিন আহম্মেদ জানান, আমাদের এলাকায় বেশ কিছু পলিথিন কারখানা গোপনে গড়ে উঠেছে। ঘিঞ্জি পরিবেশের ভেতরে পলিথিন কারখানা এমনভাবে রয়েছে যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ছোট পরিসরে গড়ে উঠেছে এ কারখানাগুলো। তিনি জানান, শুধু পলিথিন নয়, প্লাস্টিক জাতীয় অনেক পণ্য এসব কারখানায় তৈরি করা হয়। প্রশাসন এ ব্যাপারে একেবারে নিশ্চুপ। বর্তমানে সারা দেশে কাঁচাবাজার থেকে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর সর্বত্রই দ্রব্য বহনে ব্যবহৃত হচ্ছে পাতলা পলিথিনের তৈরি ব্যাগ। জালি ব্যাগ বা কাগজের ব্যাগের উৎপাদনের চেয়ে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনের খরচ অনেক কম। এ কারণে বসতবাড়ির একটি বা দু’টি কামরার মধ্যেই একেকটি কারখানা গড়ে উঠেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজনের) সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পরিবেশ সম্পর্কে সরকার অনেক কিছুই অঙ্গীকার করে। কিন্তু বাস্তবায়নের সময় যতো বাধা। পরিবেশ নষ্টকারী এ পণ্যটি কিছু রাজনৈতিক বিত্তশালীদের কারণে বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা জনগণকে এ ব্যাপারে সচেতন করতে পারি কিন্তু বন্ধ করতে পারি না। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, যে প্রক্রিয়ায় পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল তা সঠিক ছিল না। আমি এর বিরোধিতা করেছিলাম। সেই আইন এখন বহাল থাকলেও আইনের কার্যকারিতা নেই। পরিবেশ অধিদফতরের ভুয়া সনদ নিয়ে অনেক কারখানা পলিথিন উৎপাদন করে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে তিনি প্রশাসনকেও দায়ী করেন। এ ব্যাপারে ডেমরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেন। বলেন, আমার জানা মতে এ এলাকায় কোনো নিষিদ্ধ পলিথিন কারখানা নেই। তবে যেহেতু এ ব্যাপারে অভিযোগ উঠেছে তাই বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। উল্লেখ্য, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে ৬ (ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে এ ঘোষণা বাস্তবায়ন করে। একই বছরের নভেম্বরের ৮ তারিখে সরকারের অপর একটি প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, সাময়িকভাবে বিস্কুট, চানাচুরের মোড়ক হিসেবে পলিথিনের ব্যবহার করা যাবে। তবে সেগুলোর পুরুত্ব অবশ্যই ১০০ মাইক্রেনের ওপরে হতে হবে। এই আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন সামগ্রী উৎপাদন, আমদানি বা বাজারজাত করে তবে তার শাস্তি হবে ১০ বছর কারাদ- বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড। কোনো ব্যক্তি যদি নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন সামগ্রী বিক্রি বা বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রদর্শন, গুদামজাতকরণ, বিতরণ ও বাণিজ্যিক উদ্দেশে পরিবহন বা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে, তার শাস্তি হবে ছয় মাস কারাদন্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড।


